অদৃশ্য মানুষের দেশ: বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী পরিবারদের নীরব যুদ্ধবাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষ কোনো ক্ষুদ্র বা বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী নয়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে প্রায় ৩ কোটির কাছাকাছি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বসবাস করছেন, যা মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। তবুও এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্র ও সমাজের মূল অগ্রাধিকারের বাইরে রয়ে গেছে।বর্তমানে যেসব প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সরকারি ভাতা কার্ডের আওতায় রয়েছেন, তারা মাসে মাত্র ৯০০ টাকা ভাতা পাচ্ছেন। বাস্তব জীবনে এই অর্থে এক মাসের ন্যূনতম জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব। ঢাকার মতো শহরে একদিনের যাতায়াত ভাড়া ও একটি সাধারণ দুপুরের খাবারেই এই অর্থ শেষ হয়ে যায়। গ্রামাঞ্চলের অসহায় প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও এই টাকায় এক সপ্তাহ চলাই কঠিন।এছাড়া সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো—লক্ষ লক্ষ প্রতিবন্ধী মানুষ আজও কোনো সরকারি কার্ড বা নিয়মিত সহায়তার আওতায় আসেননি। তাদের নাম নেই তালিকায়, কণ্ঠ নেই অভিযোগে, চোখ নেই রাষ্ট্রের নজরে।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিবন্ধী মানুষদের সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতাও একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীরা অনেক ক্ষেত্রে নিজের আত্মীয় বা পরিচিতজনের দ্বারা যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হন। যারা বাক প্রতিবন্ধী বা মানসিক প্রতিবন্ধী, তাদের জন্য অভিযোগ করা বা বিচার চাওয়াই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সামাজিক নীরবতা ও লজ্জার সংস্কৃতি এসব অপরাধকে আরও আড়াল করে রাখছে।একই সঙ্গে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার অপ্রাপ্যতা প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোর জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। নিয়মিত চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি বা অকুপেশনাল থেরাপি, স্পেশাল হুইলচেয়ার ও সহায়ক যন্ত্র, বিশেষ পুষ্টি ও যত্ন—এসব প্রয়োজন থাকলেও অধিকাংশ পরিবার জানে না কোথায় যাবে বা কাকে বলবে। আর জানলেও তাদের নেই সেই আর্থিক সামর্থ্য।এই প্রেক্ষাপটে আমরা হাফেজী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (HCSB) সরাসরি মাঠে নেমে প্রতিবন্ধী পরিবারদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। টিম হাফেজ্জী দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় গিয়ে প্রতিবন্ধী পরিবারের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছে, তাদের জীবনসংগ্রাম ও দুঃখ-কষ্টের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে এবং জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে।প্রতিবন্ধী মানবিক সহায়তা প্রজেক্ট (Disability Rehabilitation Project)–এর আওতায় বর্তমানে—• প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবা• প্রয়োজন অনুযায়ী হুইলচেয়ার ও সহায়ক উপকরণ বিতরণ• ফিজিওথেরাপি ও থেরাপি সাপোর্ট• পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ• প্রতিবন্ধী শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন• নির্যাতনের শিকারদের নীরব সুরক্ষা ও সহায়তাচলমান রয়েছে।এছাড়াও এই প্রজেক্টের আওতায় প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোর খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রমজানে ইফতার ও মাসব্যাপী বাজার সহায়তা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় পোশাক বিতরণ এবং কুরবানির মৌসুমে কুরবানির গরু/মাংস বিতরণ কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—উৎসবগুলো যেন প্রতিবন্ধী পরিবারদের জন্য লজ্জা বা বঞ্চনার নয়, বরং সম্মানের ও আনন্দের হয়।প্রতিবন্ধী মানুষদের সহায়তা কোনো দয়া বা করুণা নয়—এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবতার নৈতিক দায়িত্ব। যে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে না, সে সমাজ কখনো সত্যিকারের উন্নত হতে পারে না।হাফেজী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (HCSB) ভবিষ্যতেও আরও বেশি প্রতিবন্ধী পরিবারের কাছে পৌঁছাতে এবং টেকসই পুনর্বাসন ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ চালিয়ে যাবে—কথা দিয়ে নয়, কর্ম দিয়ে।এই কার্যক্রমকে টেকসই ও বিস্তৃত করতে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোর চিকিৎসা, থেরাপি, হুইলচেয়ারসহ সহায়ক উপকরণ, নিরাপত্তা সহায়তা এবং রমজান–ঈদ–কুরবানি মৌসুমি মানবিক কার্যক্রমে পাশে থাকতে আপনার যাকাত, ফিতরা, সদকায়ে জারিয়া এবং সাধারণ দান দিয়ে সহযোগিতা করুন। যারা নিয়মিতভাবে এই মানবিক কাজে যুক্ত থাকতে চান, তারা অটো-পে সুবিধার মাধ্যমে প্রতিদিন/মাসে ধারাবাহিক দান করে এই প্রজেক্টকে শক্তিশালী করতে পারেন। আপনার একটি দানই কারও চিকিৎসা, চলাচল, সম্মান এবং নিরাপদ জীবনের পথ খুলে দিতে পারে।...