

মৃত্যুর পর মানুষের সব আমল একদিন থেমে যায়। নামাজ, রোজা, নফল ইবাদত—সবকিছুরই সমাপ্তি ঘটে। এমনকি জীবদ্দশায় করা অনেক দান-সদকাও একসময় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু আমল আছে, যার প্রতিদান মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। ইসলামে একে বলা হয় **সাদাকায়ে জারিয়া**—এমন একটি নেকির ধারা, যা কবরের নিঃসঙ্গতাতেও মানুষের আমলনামায় সওয়াব পৌঁছে দিতে থাকে।
আর সেই সাদাকায়ে জারিয়ার অন্যতম উত্তম মাধ্যম হলো ইলম অর্জনে সহযোগিতা করা।
একটি যুদ্ধ শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ। আবার আমাদের নিজেদের দেশেও এমন অনেক জনপদ রয়েছে, যেখানে অসংখ্য শিশু এখনো দ্বীনি শিক্ষার মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
স্থান ভিন্ন, বাস্তবতা ভিন্ন, কিন্তু সংকট একটাই—আলোর অভাব।
সেই আলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুজুর্গ হযরত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর নামে প্রতিষ্ঠিত, দেশের প্রথম নিবন্ধিত সেবামূলক সংস্থা হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের দিকনির্দেশনায় শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
২০২৩ সাল থেকে চলমান যুদ্ধ গাজার অসংখ্য পরিবারকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। অনেক শিশু হারিয়েছে তাদের বাবা-মাকে, অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা।
এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও গাজায় জরুরী সহায়তা প্রকল্পের পাশাপাশি, হাফেজ্জী পরিচালিত একটি মাদ্রাসায় আজ তিন শতাধিক শিশু কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করছে। তাদের অনেকের বাবা শহীদ হয়েছেন, কেউ গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।
তবুও তারা কোরআনকে ছেড়ে দেয়নি।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও সেখানে প্রতিদিন কোরআনের তিলাওয়াত ধ্বনিত হয়। শিক্ষক আছেন, পাঠ চলছে, আর নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে জ্বলছে ঈমান ও জ্ঞানের আলো।
এবার আসি আমাদের নিজের দেশে।
লালমনিরহাটের আঙ্গুরপোতা, দহগ্রাম, তিন বিঘা করিডোরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজও দ্বীনি শিক্ষার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
এই অঞ্চলগুলোতেই টিম হাফেজ্জী প্রতিষ্ঠা করেছে ১০টি মক্তব। বর্তমানে সেখানে সাত শতাধিক শিশু কোরআন শিক্ষা, ইসলামের মৌলিক জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষায় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
দিনমজুর, কৃষক ও খেটে-খাওয়া পরিবারের এসব সন্তান হয়তো বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পায় না, কিন্তু তারা যেন অন্তত কোরআনের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়—সেই লক্ষ্যেই চলছে এই প্রচেষ্টা।
নীলফামারীর এই মাদ্রাসার গল্প অন্যরকম।
এখানে একজন শিক্ষক নিজেই দৃষ্টিহীন। কিন্তু দৃষ্টি না থাকলেও তাঁর হৃদয়ে রয়েছে কোরআনের আলো। তিনি ব্রেইল পদ্ধতিতে শিশুদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন—চোখ না থাকলেও একজন মানুষ আল্লাহর কালামের আলো থেকে বঞ্চিত হতে পারে না।
বর্তমানে এখানে দৃষ্টিহীন, ইয়াতিম ও অসচ্ছল পরিবারের ৪০ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে।
সংখ্যাটি হয়তো এই অঞ্চলের প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় খুবই ছোট। আমরা তা জানি। তবে এটুকুই আমাদের জন্য আশার আলো যে, এই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে—যদি আপনাদের আন্তরিক দোয়া ও সহযোগিতা আমাদের সঙ্গে থাকে।
আজ আপনি যে শিশুর শিক্ষার জন্য সহযোগিতা করবেন, হয়তো আগামীকাল সেই শিশুই একজন হাফেজে কোরআন হবে। হয়তো সে শত শত মানুষকে কোরআন শিক্ষা দেবে। হয়তো তার শিখানো কোনো শিক্ষার্থী আবার অন্যদের শেখাবে।
এভাবেই একটি ছোট্ট সহযোগিতা পরিণত হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী সওয়াবের ধারায়।
গাজার সেই শিশুটি আপনার নাম জানে না।
উত্তরবঙ্গের সেই শিশুটি আপনাকে চেনে না।
নীলফামারীর সেই দৃষ্টিহীন শিশুটিও জানে না আপনি কে।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা জানেন।
আর একজন মুমিনের জন্য সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আপনার সহযোগিতায় একজন শিশু কোরআন শিখবে, একজন শিক্ষার্থী দ্বীনের আলো পাবে, একটি পরিবার আশার নতুন দিশা খুঁজে পাবে।
আজই হাফেজ্জী শিক্ষা প্রকল্পে অংশগ্রহণ করুন এবং নিজের জন্য একটি চলমান সাদাকায়ে জারিয়ার ধারা শুরু করুন।
হয়তো আপনার এই ছোট্ট অবদানই কোনো শিশুর জীবন বদলে দেবে—আর সেই পরিবর্তনের প্রতিদান আপনি পেতে থাকবেন দুনিয়া ও আখিরাতে, ইনশাআল্লাহ।